ফেনীতে নিরবে কেটে গেলো জহির রায়হানের ৭৯তম জন্মদিন

৩৩১    0

zahir raihan

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও সাংবাদিক জহির রায়হানের ৭৯তম জন্মদিন তার নিজ জেলা ফেনীতে নিরবে কেটে গেছে। ফেনীর এ সোনালী সন্তানের জন্মদিনে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করলেও ফেনীতে রয়ে গেছেন উপেক্ষিত। তার নামে প্রতিষ্ঠিত শহরের মিজান রোডের শহীদ জহির রায়হান হলটি সম্প্রসারনের নামে ভাঙ্গা হলেও তা গত প্রায় ১০ বছরেও গড়া হয়নি। একসময় এ হলটিকে ঘিরে ফেনীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন সরব ছিলো। এনিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও মেলেনি কোন আশার বানী।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীর উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতীম তারুণ্যমণ্ডিত নির্মাতা-লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। তাঁর মধ্যে সুস্পষ্ট শ্রেনীচেতনা কাজ করতো। শ্রেণী বৈষম্য ও সমাজ বৈষম্য তথা সমাজের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা লুম্পেনসুলভ সুবিধাবাদ সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিল। এসব তিনি তাঁর গল্প-উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি আমাদের দুই প্রিয় ও বড় অর্জনের বীরসেনানী ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধের সময়ই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথকতা। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি একটি প্রবঞ্চিত টেলিফোন পেয়ে ছুটে যান মিরপুরে তাঁর প্রিয় ‘বড়দা’ কথাশিল্পী ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে। যাওয়ার সময় পান্না কায়সারকে (শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী) বলে যান, অগ্রজকে না নিয়ে তিনি ফিরবেন না। তাঁর কথাই সত্যি হলো, প্রিয় অগ্রজকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান চিরদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে গেলেন। একই পরিবার থেকে এমন দুজন প্রতিভাবান শিল্পীকে ঘাতকরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গনে জহির রায়হান ও শহীদুল্লাহ কায়সারের অবদান চিরস্মরণীয়। চলচ্চিত্র, নাটক, সাংবাদিকতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রগতিশীল রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-র মুক্তিযুদ্ধে দুই ভাইয়ের অবদান অসামান্য।

বাল্য ও কৈশোরে পড়ালেখা করেন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউট ও আলিয়া মাদরাসায়। দেশভাগের পর তিনি কলকাতা থেকে ফেনীতে চলে আসেন। সাহিত্যে অনুরাগের কারণে তিনি বিজ্ঞান ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে তিনি বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৬ সালে কলকাতার প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকার চলচ্চিত্র শিল্পে যুক্ত হন। ১৯৬১ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনও আসেনি’।

কালজয়ী ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান শিল্পের যে শাখায় হাত রেখেছেন, সেখানেই হয়েছেন সফল। তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে তিনি লেখক হিসেবেও পরিচিতি পান। ১৯৬১ সালে চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। আবহমান বাংলার মিথ বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী নিয়ে তিনি ১৯৬৬ সালে নির্মাণ করেন ‘বেহুলা’। মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় তাঁর আরেকটি আলোচিত ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যান তিনি। যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে তিনি নির্মাণ করেন বিখ্যাত প্রামাণ্য চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। তাঁর অন্যান্য চলচ্চিত্র : কখনও আসেনি (১৯৬১); সোনার কাজল (কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে, ১৯৬২); কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩); সঙ্গম (১৯৬৪); বাহানা (১৯৬৫); আনোয়ারা (১৯৬৭); এ স্টেট ইজ বর্ন (১৯৭১); বার্থ অফ আ নেশন (১৯৭১); লেট দেয়ার বি লাইট (অসমাপ্ত, ১৯৭০)। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি, উপন্যাস : শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০); হাজার বছর ধরে (১৯৬৪); আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯); বরফ গলা নদী (১৯৬৯); আর কত দিন (১৯৭০)। গল্পগ্রন্থ : সূর্যগ্রহণ (১৯৫৫); তৃষ্ণা (১৯৬২); একুশে ফেব্র“য়ারি (১৯৭০); কয়েকটি মৃত্যু।

ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে হেনা লাহিড়ী সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬/৬৮ সালে কোহিনূর আকতার সুচন্দাকে; দুজনেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। সুমিতা দেবীর দুই ছেলে বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। দুজনেই প্রতিষ্ঠিত নাট্যনির্মাতা। সুচন্দা’র ছোট ছেলে তপু রায়হানও অভিনেতা। জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে অভিনেত্রী-নির্মাতা শমী কায়সার।
জহির রায়হান ১৯৬৪ সালে ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার; ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে নিগার পুরস্কার; ১৯৭১ সালে সাহিত্যে (উপন্যাস) অবদানের জন্য মরণোত্তর বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭২ সালে ঘোষিত); ১৯৭৭ সালে চলচ্চিত্র শিল্পে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় একুশে পদক (মরণোত্তর) এবং ১৯৯২ সালে সাহিত্যে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন। তিনি প্রতিজন বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছেন দেশপ্রেম ও অসামান্য সব সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে।

Leave A Reply